গোলি কা পিছে কেয়া হ্যায়?
শ্রীশুভ্র
গোলি কা পিছে কেয়া হ্যায়?
স্বচ্ছ ভারত, ডিজিটাল ভারত, বিলিয়নিয়ার ভারত, পারমণবিক শক্তিধর ভারত, সিকিউরিটি কাউন্সিলের এন্ট্রান্স-টেস্টে ভারত, কতরকমের ভারত! আর সেই ভারতের বায়ুসেনার একটি ঘাঁটিতেই ঘাঁটি গেড়ে আক্রমণ শানিয়েছে পাক মদতপুষ্ট জঙ্গিগোষ্ঠীর আত্মঘাতী সেনারা! শুরু হল ২০১৬! নববর্ষের শুভেচ্ছার সুনামির উত্তাল তরঙ্গের সুরভিত রেশ থিতিয়ে আসার আগেই।
কি বিচিত্র এই দেশ বলে বিস্মিত হয়ে ওঠা আলেকজান্ডারের পর কেটে গিয়েছে দুইটি সহস্রাব্দ। কিন্তু যে ভুখণ্ডের বিচিত্র লীলায় তিনি হতবাক হয়ে পড়েছিলেন, সেই ভারতীয় উপমহাদেশ আছে সেই তিমিরেই। আফগানিস্তানের ভারতীয় দুতাবাসে জঙ্গী হামলা! ভারতীয় বায়ুসেনার ঘাঁটিতেই বোমা বারুদ নিয়ে ঢুকে পড়া! ঘটনাগুলি কিন্তু একই সূত্রে গ্রথিত।
এবার একটু প্রেক্ষাপটটা দেখে নেওয়া যাক! ১৯৪৭এর ক্ষমতা হস্তান্তরের পর থেকেই পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গতি প্রকৃতি ঠিক করে দেওয়ার অভিভাকত্ব নিজের হাতে তুলে নেয়, ভারতবর্ষের পরম মিত্র মার্কিণ যুক্তরাষ্ট্র। এই কথা খবরের কাগজের পাঠক মাত্রেই অবদিত। ১৯৭১ এর বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে জড়িয়ে পড়ে ভারতকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যে সামরিক অভিযানে নামতে হয়েছিল, তার পেছনে ইউনাইটেড স্টেস অফ আমেরিকার কি ভুমিকা ছিল, সে কথা বর্তমান প্রজন্মের নাগরিকরা না জানলেও ইতিহাসে স্পষ্টই ধরা আছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির গতি প্রকৃতি তারপর কিভাবে বিন্যস্ত হতে হতে আজকের দশকে এসে পৌঁছিয়েছে সেকথাও রাজনীতি মনস্ক ব্যক্তি মাত্রেই অজানা। নয়, কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্ষমতা বিন্যসে রদবদল হয়ে গেলেও, বিশ্বরাজনীতির ধরণ ধারণে ওলোট পালোট হয়ে গেলেও একটি বিষয় কিন্তু আজও একই বিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছে, সে হলো পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী ভারত ও পাকিস্তান উভয় রাষ্ট্রেরেই আজও পরম মিত্র মার্কীণ যুক্তরাষ্ট্র। এই প্রসঙ্গে স্মরণে রাখা প্রয়োজন, ভারত ও রাশিয়ার পরম মৈত্রীর দিনগুলিতেও কিন্তু ভারত-মার্কীণ সম্পর্কের মধুরতা কোনদিনও ক্ষুণ্ণ হয়নি এতটুকুও। ভারতের বাজারে চিরকালই মেড ইন আমেরিকার জনপ্রিয়তা ও সহজলভ্যতা সবচেয়ে বেশি। এ কথা অস্বীকার করার উপায়ই নেই। আর স্বাধীন পাকিস্তানের মার্কীণ তাঁবেদারি বা পাকিস্তানের রাজনীতি ও অর্থনীতি এবং সামরিক কার্যক্রমে মার্কীণ অভিভাকত্ব, সিআইএর খবরদারী, পেন্টাগণের কড়া নজরদারীর কথা কারুরই অজানা। নয়। অজানা নয়, আজ ভারত মর্কীণ এফ১৬ বোমারু বিমান কিনলে,কাল ইসলামাবাদের এফ১৫ এর জন্যে পেন্টাগণ বায়না ধরার কাহিনীও। ফলে মার্কীন সামরিক শিল্পে মুনাফার জোয়ার সে দেশের অর্থনীতিকে কিভাবে চাঙ্গা করে তুলতে থাকে দশকের পর দশক, সেকথাও অর্থনীতির ছাত্র না হয়েও অধিকাংশ রাজনীতি সচেতন মানুষ মাত্রেই জানেন।
অনেকেই জানেন পাকিস্তানের ভুখণ্ডেই কত বড়ো মার্কিণ সামরিক ঘাঁটি গড়ে উঠেছে। অনেকেই জানেন পাকিস্তানের যে কোন স্থানে যে কোন সময়ে, পাকিস্তানের রাষ্ট্রশক্তির অনুমোদনোর তোয়াক্কা না করেই মার্কিণ সামরিক বাহিনী কিভাবে দিনের পর দিন সামরিক অভিজান চালিয়ে যায় সন্ত্রাসবাদ দমনের ধুয়ো তুলে, সন্ত্রাসবাদী নিধনের অজুহাতে। অনেকেই এটাও জানেন কি পাকিস্তান, কি ভারত, এই দুই দেশই ৩৬৫x২৪ ঘন্টা নিশ্ছিদ্র ভাবে পেন্টাগণের মাইক্রস্কোপের নজরদারীতে থাকে। আর দুই দেশের জনগণ মাত্রেই জানেন পাকিস্তানের রাষ্ট্রশক্তি থেকে শুরু করে সামরিক বাহিনী ও প্রতিটি জঙ্গীগোষ্ঠীর উপর মার্কীণ পরাশক্তির প্রভাবের কথা। দুই দেশরই নাগরিক মাত্রেই জানেন ভারত মার্কীণ মৈত্রের কথাও। বছর বছর ঢাকঢোল বাজিয়ে ভারত মার্কীণ সামরিক বাহিনীর যৌথমহরাগুলির কথাও কারুর অজানা নয়। এবং লক্ষ্মণীয় ভাবেই যে মহরাগুলি কখনো মার্কীণ ভুখন্ড বা তার আসে পাশে সংঘটিত হয় না। আর সেই জন্যেই অত্যন্ত সাধারণ জ্ঞানের সাধারণ সীমানার চৌহদ্দীতেই তখন একটাই প্রশ্ন জাগে, যে ভারত ও পাকিস্তানের উপর মার্কীণ বড়োদাদার এতটা প্রভাব, নজরদারী, ও খবরদারী, সেই ভারত ও পাকিস্তানকে গত সাত দশক ধরেই পরাস্পরিক শত্রুতা জিয়েই রাখতে হয় কেন এইভাবেই! যে ভাবে দুই দেশের নাগরিকদের কাছেই দুইদেশ পরস্পরের শত্রু হয়ে দাঁড়ায়? দুই দেশের নাগরিকদের মাথার উপরেই সর্বদা পাক-ভারত যুদ্ধের খাঁড়া ঝুলতে থাকে কেন? আর যখন তখন পাকমদতপুষ্ট সামরিক অস্ত্রে সজ্জিত জঙ্গীরা ভারতীয় ভুখণ্ডে ঢুকে নাশকতা চালিয়ে যায়ই বা ঠিক কিভাবে?
প্রশ্নগুলি আরও একটু ভালো করে খুঁটিয়ে দেখা যাক। পারনাণবিক শক্তিধর ভারত, ১০০ কোটির জনসংখ্যার ভারত, বছর বছর ভারত-মার্কিণ সামরিক বাহিনীর যৌথ মহড়া দেওয়া ভারত, মার্কীণ মুলুক থেকে, ফ্রান্স ও ইজরায়েল থেকে জনগণনেরই করের টাকায় কিনে আনা অতিরিক্ত মূল্যের সর্বাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে বলীয়ান ডিজিটাল ভারতে পাকমদতপুষ্ট জঙ্গীরা ঢুকেই বা পরে কাদের সুবাদে কোন ফাঁক দিয়ে? তবে কি ভারতীয় সুরক্ষা বন্দোবস্ত মান্ধত্বার বাবার আমলেই পড়ে আছে? নাকি ভারতীয় সামরিক বাহিনী বিশ্বের অন্যতম অপদার্থ বাহিনীগুলির অন্যতম! আর মার্কীণ অভিভাবকত্বের তত্বাবধানে থাকা পাকিস্তানের রাষ্ট্রশক্তির মদতপুষ্ট জঙ্গীবাহিনীর সেনারা ভারতীয় সুরক্ষা বাহিনীর থেকে অধিকতর শক্তিধর?
দ্বিতীয় যে প্রশ্নটি অতি সাধারণ বুদ্ধিতেই উঠে আসার কথা সেটি হল, যে পাকিস্তানের মার্কীণ নজরদারীর বাইরে ট্যঁ ফুঁ করার উপায় নেই। যে পাকিস্তান পেন্টাগণের হকুম তামিল করতেই তালিবান ও আলকায়দাকে সবরকম সাহায্য করে এসেছিল, যে পাকিস্তানের ইচ্ছে অনিচ্ছার তোয়াক্কা না করেই মার্কীণ সেনরা পাকিস্তানের যেখানে সেখানে যখন তখন উগ্রবাদীদের ধরে ফেলে, খতম করে আবিশ্ব প্রচার করে বাহবা কুড়ায়, সেই মার্কিণ শক্তির কড়া নজরদারী এড়িয়ে একজন পাকিস্তানীরও কি আদৌ উপায় আছে ভারতীয় ভুখণ্ডে প্রবেশ করে নাশকতা চালিয়ে যাওয়ার? এবং লক্ষণীয়, প্রায় প্রতিটি নাশকতার পরেই সংবাদ মাধ্যমসূত্রে জানিয়ে দেওয়াও হয় সেই নশকতার আগাম সতর্কতা সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রশক্তিকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল পেন্টাগন থেকে! বাহবা! অথচ মার্কীণ বশংবদ রাষ্ট্রশক্তি সেই বিষয়ে কোনই সতর্কতা অবলম্বন করে নি।
আচ্ছা, এবারে তৃতীয় একটি প্রশ্নও কি উঠে আসছে না, যে সতর্কবার্তাগুলি পেন্টাগন থেকে নিয়মিত হরির লুটের বাতাসার মতো বিলি করা হয়, সেই আগাম নাশকতার গুপ্ত তথ্যগুলি ভারতীয় সামরিক বাহিনীর নজরে আসে না পাকিস্তানের এক ফুট দূরত্বে থেকেও, অথচ পৃথিবীর উল্টো গোলার্ধে থেকেও পেন্টাগনের নজর এড়ায় না কি করে? এটা চোর কে চুরি করতে পাঠিয়ে গৃহস্থকে সাবধান করার মতো বিষয় নয় তো?
চতুর্থ যে প্রশ্নটি স্বভাবতঃই উঠে আসা উচিত, ভারতীয় বায়ুসেনার সুরক্ষিত ঘাঁটি তো আর আমাদের গৃহস্থ বাড়ীর মতো অরক্ষিত থাকে না, যে শাবলের চাড় দিয়ে তালা ভেঙ্গে ঢুকে পড়া যায় চট করেই! তাহলে ভিতর থেকে নিমন্ত্রণ না থাকলে বা সদর দরজা হাট করে খুলে না রাখলে নাশকতার উদ্দেশ্যে গোলা বারুদ নিয়ে তো কারুর পক্ষে চট করে ঢুকে পড়া সম্ভবই নয়। তাই তো! কই রাশিয়া আমেরিকা ফ্রান্স ইংল্যাণ্ডের সামরিক ঘাঁটিগুলিতে আলকায়দা, আইএসআই এর মতো ভয়ঙ্কর জঙ্গিগোষ্ঠীগুলিকেও তো কোনদিন দুম করে গোলা বারুদ নিয়ে ঢুকে পড়তে দেখা যায় নি? তবে?
পঞ্চম যে প্রশ্নটি খুব স্পষ্ট ভাবেই উঠে আসা উচিত সেইটি হল যে, ভারতের পরম মিত্র মার্কীণ যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সামরিক শক্তি, যে শক্তির অভিভাবকত্বের নজর এড়িয়ে পাকিস্তানের রাষ্ট্রশক্তি, সামরিক বাহিনী, ও বিভিন্ন পাকমদতপুষ্ট জঙ্গিবাহিনীগুলির একটি গুলিও ছোঁড়ার ক্ষমতা ও উপায় কোনটাই নেই, সেই মার্কীণ শক্তির পরম মিত্র ভারতকেই বা বারংবার কেন সেই একটিই রাষ্ট্রের মদতপুষ্ট জঙ্গীদের নিশানা হতে হয়? এই প্রশ্নটির সদুত্তর পাওয়া কিন্তু খুব জরুরী।
ডিজিটাল ভারতের ফাঁক ফোঁকরগুলি যে কতখানি বড়ো, সে তো জনসাধারণের চোখেই পড়ছে, কিন্তু স্বচ্ছ ভারতের স্বচ্ছতা নিয়েই যদি পরবর্তী প্রশ্নটি উঠে আসে তবে কি খুব ভুল হবে? ভারতীয় সামরিক বাহিনী, তার নজরদারী, সুরক্ষা ব্যবস্থা কি এতটাই পঙ্গু যে বায়ুসেনার ঘাঁটিতেই জঙ্গি হানা তাও আকাশ পথে নয়! আর এই সূত্রেই আমরা যদি বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করি, এই ধরণের হামলাগুলিতে বস্তুতু কাদের লাভ হয় বেশি? তাহলে হয়তো স্বচ্ছ ভারতের অস্বচ্ছ পর্দাটাও খুলে পড়তে পারে। ওদিকে সুইসব্যঙ্কের লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি টাকা উদ্ধার করে জনপ্রতি পনেরো লক্ষ টাকা দেওয়ার নির্বাচনী ঢপটা বেঢপ ভাবে জনগণের কাছে বেআব্রু হয়ে পড়তে থাকার অস্বস্তি থেকে আপাতত তো বাঁচোয়া! জনসাধারণের মনে পাকজুজুর ভয় দেখিয়ে আবার কটা দিন নিশ্চিন্তে গদিয়ান থাকা যেতে পারবে এবার! ২০১৬ তাই বেশ একটা যুদ্ধ যুদ্ধ আমেজ তৈরীতে যে সহায়ক হয়ে উঠবে রাষ্ট্রশক্তির পক্ষে, সামরিক ঘাঁটিতে এই ধরণের জঙ্গি নাশকতা সেই ছবিটাই স্পষ্ট করে তোলে মূলত। আর তখন জনপ্রতি পনেরো লক্ষ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রতি তো দুরঅস্ত, কর্মসংস্থান, স্বাস্থসুরক্ষা শিক্ষায় সরকারী দায়িত্ব দুর্নীতিমুক্ত ভারত গড়ার দায় এই সবকটি থেকেই অব্যহতি পেয়ে আবার বরং একটা কার্গিলট্যাক্স সদৃশ্য করের বোঝা চাপিয়ে জনগণের মাথার ঘাম পায়ে ফেলা টাকার কিছুটাও বেশ হাতিয়েও নেওয়া যাবে সহজে দেশপ্রেমের বাণী শুনিয়েই! মন কি বাত বলে কথা!
মূল লেখাটি এইখানে প্রকাশিত
No comments:
Post a Comment